||  ড. দেবাশিস দে  || 

সকালে উঠেই সদর দরজার বাইরে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, নোংরা জামা কাপড় পরা এক ঘুমন্ত বালক কে দেখে চমকে উঠলেন হিন্দু বাঙালি বাবুটি। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন বালকটির সাথে আর কেউ নেই। তাঁর দয়া হল। তিনি তাকে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেলেন। কাজ দিলেন বাড়ির ফাই ফরমাশ খাটার। কাজের ফাঁকে কিশোর মন চলে যায় পড়াশোনার আলোচনায়। গৃহশিক্ষক পড়াতে এলে বাড়ির শিশুদের পাঠে কান থাকে সজাগ। কোনো গাণিতিক সমস্যার  আলোচনা কানে এলে সমাধান নিজে নিজেই ভাবে। এভাবেই ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। বাড়ির ছেলেরা একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হলে সে খুব সহজে উত্তর করে দিল। বাড়ির সবাই ভীষণ অবাক হল – নিশ্চয়ই সে আত্মপরিচয় গোপন করে ঐ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে সবাই তাড়িয়ে দিতে উদ্যত হল। বাড়ির মালিক খুব জোরাজুরি করতেই বেরিয়ে এল পরিচয়। নাম তার আজিজুল হক, পুরো নাম খান বাহাদুর কাজী আজিজুল হক। জন্ম অবিভক্ত বাংলার খূলনা জেলার পাইগ্রাম কশবা গ্রামে ১৮৭২ সালে। জন্মের কয়েক বছেরর মধ্যেই এক নৌকা দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তার বাবা মা কে। বড়দার ওপর পড়ল পরিবারের সব দায়-দায়িত্ব। ওদিকে ছোট আজিজুলের ছিল প্রচণ্ড খাবারের প্রতি লোভ। প্রায়শঃই এর জন্য দাদার কাছে তাকে তিরস্কৃত হতে হয়। একদিন দাদা দিনের শেষে খুব ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে দেখে ভাই নিজের খাবার শেষ করে দাদার খাবার ও খানিকটা খেয়ে ফেলেছে। দাদা ভীষণ রেগে গিয়ে ভাইকে আঘাত করে। অপমানিত আজিজুল বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিল। সকলের অলক্ষ্যে চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়ে উদ্দেশ্যহীন মাত্র ১২ বছর বয়সী আজিজুল। 

 

 পৌঁছে গেল কলকাতা, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজধানী। আশ্রয় পেল হিন্দু পরিবারটিতে। ১৮৮৪ সাল। রক্ষণশীল হিন্দু পরিবার হয়েও কিশোর আজিজুলের পরিচয় জানতেই তার উপযুক্ত পড়াশোনার ব্যবস্থা করলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে আজিজুল এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা।  শুরু হল আজিজুলের নতুন জীবন। খুব ভাল ভাবে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হলেন সেই সময়ের নামী কলেজ প্রেসিডেন্সিতে। সেখানে বিজ্ঞানে বিশেষত গণিতে পারদর্শিতা দেখান।  কলেজের প্রিন্সিপাল তাঁর ওপর অত্যন্ত খুশি ছিলেন। এই সময় পরাধীন ভারতবর্ষে, বাংলার ইন্সপেক্টর জেনেরাল ছিলেন স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি, যিনি অপরাধ তদন্তে সহায়ক হয়  সেইরূপ একটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট চিহ্নিতকরনের জন্য একটি কার্যকরী সিস্টেম চালু করতে চাইছিলেন। তাঁর গোয়েন্দা বিভাগের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট চিহ্নিতকরনের কাজে সাহায্য চেয়ে স্যার হেনরি চিঠি    লিখলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপালকে। অনুরোধ করলেন স্ট্যাটিসটিক্সে ভাল এরকম কোনও ছাত্র পাঠানোর জন্য। প্রিন্সিপাল আজিজুল হকের নাম প্রস্তাব করলেন। সাথে পাঠালেন আর এক তরুণ প্রতিভা হেমচন্দ্র বোসকে। হক এবং বোস দুজনেই বাংলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর নিযুক্ত  হলেন। দুই বাঙালি তরুণ স্যার হেনরির নেতৃত্বে পূর্ণ উদ্যমে মগ্ন হল ফিঙ্গারপ্রিন্ট চিহ্নিতকরনের  এক আদর্শ গাণিতিক মডেল প্রস্তুতিতে। হক এবং বোস যৌথভাবে প্রস্তুত করলেন একটি  Classification System (১৮৯৯-১৯০০), যার গাণিতিক দিকটি তৈরি করলেন হক এবং Telegraphic Code অংশটি বোস। মডেলটি খরচ, নির্ভুলতা এবং সময় সব দিক থেকে আগের Anthropometric Technique এর থেকে কার্যকরী। 

খান বাহাদুর কাজি আজিজুল হক (জন্ম: ১৮৭২; মৃত্যু: ১৯৩৫)
Sir Edward Henry(1850-1931)

তাই অচিরেই সারা বিশ্ব জুড়ে মডেলটি জনপ্রিয়তা লাভ করলো। কিন্তু ঔপনিবেশিক  ব্রিটিশদের কাছে বাঙালি গবেষকদের অবদান অবদমিত রইল। স্যার হেনরির নাম অনুসারে সিস্টেমটির নাম হল Henry System of Fingerprint Classification বা সংক্ষেপে Henry Classification System।                

ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও বায়োমেট্রিক: ১৬০০ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপে হাতের ছাপ ও   ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। কিন্তু অপরাধ তদন্তে ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যবহার এবং অপরাধী  সনাক্তকরনে হাতের ছাপ মেলানো শুরু হয় ঊনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে। ১৮৫৯ সালে স্যার  উইলিয়াম জেমস হারশেল প্রথম বলেন যে হাতের ছাপ সারা জীবনে কোনো মানুষের একই থাকে। তিনি যখন বাংলায় হুগলী জেলার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে কর্মরত (১৮৭৭), সেইসময়   আইনি নথিতে হাতের আঙুলের ছাপকে প্রথম বৈধতা দেন যা পরে স্বাক্ষরের বিকল্প হিসেবে প্রচলিত হয়। ১৮৮০ সালে এক ব্রিটিশ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ড. হেনরি ফাউদ প্রথম অপরাধ তদন্তে ফিঙ্গারপ্রিন্টের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহারের কথা একটি জার্নালে প্রকাশ করেন। অন্যদিকে স্যার ফ্রান্সিস গ্যালটন (১৮২২-১৯১১) নামে একজন ইংরেজ পরিসংখ্যানবিদ ‘Finger Prints’ গ্রন্থে (১৮৯২) হারশেল ও ফাউদের প্রক্রিয়ার তুলনামূলক বিবরণসহ সার্বিক সনাক্তকরন পদ্ধতি   প্রকাশ করেন। অঙ্ক কষে দেখান, দুজন ভিন্ন ব্যক্তির হাতের ছাপ একই হওয়ার সম্ভাব্যতা।  গ্রন্থটি  তৎকালীন সময়ে  অত্যন্ত সাড়া ফেলে। তিনিই প্রথম Finger Print-এ তিন ধরনের মুল প্যাটার্নের কথা বলেন। সেগুলি হল loop, whorl আর  arch১৮৯৪ সালে বেঙ্গল পুলিশের Inspector General স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি প্রথম ফিঙ্গার প্রিন্টকে অপরাধ তদন্তে ব্যবহারে আগ্রহী হন। যদিও সেই সময়ে প্রচলিত প্রথা ছিল ‘Bertillonage’, যা  ‘Anthropometry’ নামে পরিচিত। এই পদ্ধতির জনক একজন ফরাসি পুলিশ অফিসার এবং বায়োমেট্রিক গবেষক আলফান্সো বার্তিলোন (১৮৫৩-১৯১৪)। অপরাধীদের চিহ্নিত করতে এই পদ্ধতিতে তাদের দেহের বিভিন্ন অংশের পরিমাপ করে রাখা হয়। মাথার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, মধ্য  আঙুলের দৈর্ঘ্য, বাম পায়ের দৈর্ঘ্য এবং কনুই থেকে মধ্যমার (আঙুলের) শীর্ষ অবধি দৈর্ঘ্য-  মূলত দেহের এই পাঁচটি অংশকে পরিমাপের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৮৯২ সাল থেকে ব্রিটিশ পুলিশ ভারতে অপরাধ তদন্তে এই পদ্ধতি ব্যবহার করত। ১৮৯৬ সালে জানুয়ারি মাসে স্যার হেনরি Anthropometry ছাড়াও বন্দীদের ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন। ১৮৯৬ থেকে ১৯২৫ এর মধ্যে স্যার হেনরির আদেশে ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় Henry Classification System চালু  হয়; যার মুল কাণ্ডারি কাজী আজিজুল হক। তাঁকে যোগ্য সহায়তা করেন সাব-ইন্সপেক্টর  হেমচন্দ্র বোস। ফিঙ্গার প্রিন্টের pattern এর ওপর ভিত্তি করে Pigeon Hole Principle ধারনাকে  কাজে লাগিয়ে একটি গাণিতিক মডেল প্রস্তুত করেন আজিজুল। আর মডেলটিতে টেলিগ্রাফি কোড ও সংকেত যোগ করেন বোস। ১৮৯৭ সালে একটি কমিশন বসে Anthropometry এবং Henry   Classification System এর কার্যকারিতার তুলনায়। রিপোর্টে Henry Classification System এর জয়-জয়াকার। ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় (১৯০০) নির্দেশ দিলেন Anthropometry এর পরিবর্তে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সনাক্তকরণে Henry Classification System ব্যবহারের। Henry Classification System পরবর্তীকালে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির ভিত তৈরি করে। ফরাসি বিজ্ঞানী পল জীন ক্যুলিয়ার সমতলের ওপর আবছা ফিঙ্গারপ্রিন্টকে কাগজে ছাপে রুপান্তর করেন আয়োডিন ফিউমিং-এর মাধ্যমে। এর সাহায্য নিয়ে লন্ডনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ১৯০১ সাল থেকে অপরাধ তদন্তে ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যবহার শুরু করে। পরের বছর থেকেই নিউইয়র্ক পুলিশ, আরও পরে ফরাসি পুলিশ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সনাক্তকরণের ব্যবহার শুরু করেন। ১৯২০ সালে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফ বি আই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিজেদের ডাটাবেসকে কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারের সাহায্যে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সনাক্তকরণ বা ম্যাচিং শুরু করে। যা অধুনা বায়োমেট্রিক   সিস্টেমের AFIS (Automated Fingerprint Identification System) প্রযুক্তি। আজকের সপ্রতিভ বায়োমেট্রিক সিস্টেমের বিবর্তন তাই আজিজুল হকের সেই গাণিতিক প্রচেষ্টার উত্তরসূরি।                                     

Anthropometric description and Bertilon

স্বীকৃতি:  ঐতিহাসিক, গবেষক এবং বিশেষজ্ঞরা বারে বারে Henry Classification System  এর প্রবর্তনে আজিজুল হকের ভুমিকা মুখ্য ব’লে স্বীকার করলেও ব্রিটিশ শাসকের কাছে তিনি ছিলেন  দীর্ঘদিন উপেক্ষিত। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ সরকারে্র কাছ থেকে পেয়েছেন ‘খান সাহিব’ এবং ১৯২৪ সালে পেয়েছেন ‘খান বাহাদুর’ উপাধি, সঙ্গে বিহারের মোতিহার এ জায়গির। একইভাবে বোস ও পেয়েছেন ‘রায় সাহিব’ ও ‘রায় বাহাদুর’। এছাড়াও উভয়েই সাম্মানিক হিসেবে পান ৫০০০ টাকা। 

বহুবছর আবিস্কারকের স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত থাকার পর অবশেষে স্যার হেনরি তাঁর ভারত সফরকালে (১৯১২) স্বীকার করে নেন “Sub Inspector of Police, Khan Bahadur Azizul Haque-the man mainly responsible for the new world wide fingerprint system of identification.”   [তথ্যঃ Chandak Sengoopta (2003), Imprint of the Raj: How fingerprint was born in colonial India, Macmillan]  

তথ্যসূত্রঃ 

Khan, Waqar A. (10 May 2017). “Qazi Azizul Haque, mathematical genius from Bengal”. DAWN.COM. Retrieved 15 February 2019.

২.”Indelible Imprints: The Genius from Khulna”. The Daily Star. 8 May 2017. Retrieved 18 December 2017.

৩. G.S. Sodhi, Jasjeet Kaur (2005). “The forgotten Indian pioneers of fingerprint science”, 185–191.

ড. দেবাশিস দে,
বিজ্ঞান লেখক ও প্রধান শিক্ষক,
সুদপুর ঊচ্চ বিদ্যালয়,
সুদপুর, পূর্ব বর্ধমানপশ্চিমবঙ্গ। 

Email: debashismathdey@gmail.com     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *